জুলাইয়ের কথা
জুলাইয়ের
কথা শুধু একটি মাসের
গল্প নয়, এটি একটি
সময়ের গল্প, একটি জাতির দীর্ঘদিনের
ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অধিকারবঞ্চতার বিরুদ্ধে
প্রতিরোধের গল্প। এটি গণতন্ত্র ও
মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ এবং জুলাই পরবর্তী
একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের
প্রত্যাশার ধারাবাহিক ইতিহাস।
জুলাইকে বুঝতে হলে শুধু জুলাই ২০২৪ এর রাজপথের দিকে তাকালে হবে না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার সংকট, মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ, গুম-নিখোঁজ, হত্যা, নির্যাতন, মামলা, গ্রেপ্তার ও নিপীড়নের নানা অভিযোগ এবং মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। এসব অভিজ্ঞতা বহু মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ, ভয়, বঞ্চনা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছিল।
এই দীর্ঘ সময়ে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, তাদের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে। সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জুলাই ২০২৪ এর আন্দোলন একটি বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানের রূপ ধারণ করে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এবং দলটির নেতাকর্মীদের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই সংগ্রামের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিএনপি সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন দেশনেত্রী” হিসেবে পরিচিত বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ভোটাধিকার এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, আন্দোলন-সংগ্রাম, কারাবন্দিত্ব ও নানা সংকটের মধ্যেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও নেতৃত্ব বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে গণতন্ত্রের সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে রয়েছে।
জুলাই তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, মানুষের ক্ষোভ ও বঞ্চনা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার একটি দীর্ঘ পথচলা।
জুলাই ২০২৪
এরপর আসে জুলাই।
একটি অধিকারভিত্তিক আন্দোলন ক্রমে বিস্তৃত হয়ে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র-তরুণদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, তাদের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষও রাজপথে যুক্ত হয়।
জুলাইয়ের সেই দিনগুলোতে রাজপথ হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, সাহস, রক্ত ও আত্মত্যাগের সাক্ষী।
কেউ আর ফিরে আসেননি।
কেউ
হারিয়েছেন চোখের আলো।
কেউ
হারিয়েছেন হাত-পা।
কেউ
সারাজীবনের জন্য বহন করছেন
শরীরের ক্ষত।
কেউ
হারিয়েছেন বাবা, মা, সন্তান, ভাই,
বোন কিংবা প্রিয়জন।
আর
অসংখ্য মানুষ জুলাইয়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আজও নিজেদের মধ্যে
বহন করে চলেছেন।
প্রতিটি মানুষের জুলাই আলাদা।
কারও জুলাই একটি মিছিলের গল্প।
কারও
জুলাই একটি গুলির শব্দ।
কারও
জুলাই হাসপাতালের বিছানায় কাটানো রাত।
কারও
জুলাই প্রিয়জনের শেষ ফোনকল।
কারও
জুলাই একজন সহযোদ্ধাকে হারানোর
বেদনা।
আবার
কারও জুলাই একটি নতুন বাংলাদেশের
স্বপ্ন।
জেভিএ
বিশ্বাস
করে এই প্রতিটি গল্পই
ইতিহাস।
কিন্তু জুলাইয়ের ইতিহাস এখানেই শেষ নয়।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সেই অধ্যায়ের সঙ্গে জন্ম নিয়েছে নতুন কিছু প্রশ্ন, প্রত্যাশা ও চাওয়া-পাওয়া।
শহীদদের পরিবারের ন্যায়বিচার কি নিশ্চিত হয়েছে?
আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধারা কি তাদের প্রাপ্য চিকিৎসা, পুনর্বাসন, অধিকার ও মর্যাদা পেয়েছেন?
জুলাইয়ের প্রতিটি প্রাণহানি, আহত হওয়া, নির্যাতন ও ক্ষতির সত্য কি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়েছে?
অন্যায় ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহি কি নিশ্চিত হয়েছে?
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি এমনভাবে সংস্কার হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রকে উপেক্ষা করতে না পারে?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
জুলাই যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই বাংলাদেশ কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি?
“জুলাইয়ের কথা” সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজবে এবং সংরক্ষণ করবে।
এখানে থাকবে শুধু বিজয়ের কথা নয়, ত্যাগের কথাও।
শুধু
অর্জনের কথা নয়, অপূর্ণতার
কথাও।
শুধু
অতীতের কথা নয়, ভবিষ্যতের
প্রত্যাশার কথাও।
এখানে সংরক্ষিত হবে—
জুলাই-পূর্ব বাংলাদেশ:
দীর্ঘদিনের
রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার
সংকট, নির্যাতন-নিপীড়ন, গুম-নিখোঁজ, হত্যা,
মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক হয়রানি এবং মানুষের জমে
থাকা ক্ষোভ ও প্রতিরোধের ইতিহাস।
জুলাই
২০২৪:
আন্দোলনের
সূচনা ও বিস্তার, রাজপথের
প্রতিরোধ, রাজনৈতিক ও সাধারণ মানুষের
অংশগ্রহণ, শহীদদের জীবন ও আত্মত্যাগ,
আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী যোদ্ধাদের
গল্প, প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি, ছবি, ভিডিও, দলিল
এবং হারিয়ে যেতে বসা অজানা
ইতিহাস।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ:
শহীদ
পরিবার ও আহতদের অধিকার,
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, ন্যায়বিচার,
জবাবদিহি, রাষ্ট্রীয় সংস্কার, মানুষের চাওয়া-পাওয়া, অর্জন, অপূর্ণতা এবং একটি নতুন
বাংলাদেশের প্রত্যাশা।
আমাদের
অঙ্গীকার:
আমরা
শুধু জুলাইকে স্মরণ করতে চাই না,
আমরা জুলাইকে সংরক্ষণ করতে চাই।
শুধু স্মৃতিস্তম্ভে নয়, মানুষের জীবনের গল্পে।
শুধু
বইয়ের পাতায় নয়, প্রত্যক্ষদর্শীর কণ্ঠে।
শুধু
সংখ্যায় নয়, প্রতিটি শহীদ
ও আহত মানুষের পৃথক
পরিচয় ও আত্মত্যাগে।
শুধু
অতীত হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের
জন্য একটি শিক্ষা ও
সতর্কবার্তা হিসেবে।
জুলাইয়ের ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের নয়, এটি তাদের সবার ইতিহাস, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছিল, ত্যাগ স্বীকার করেছিল এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল।
জুলাইয়ের কথা সেই পুরো ইতিহাসকে মানুষের কণ্ঠে, মানুষের স্মৃতিতে এবং নির্ভরযোগ্য দলিলের মাধ্যমে সংরক্ষণ করার জেভিএ এর একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ।
