যোদ্ধার প্রোফাইল

আত্তাপুর চৌধুরী তসীন
- ক্যাটাগরি
- ক্যাটাগরি-সি
- নাম
- আত্তাপুর চৌধুরী তসীন
- বয়স
- 20 বছর
- পেশা
- চাকুরী
- এমআইএস নাম্বার
- 4044
- গ্যাজেট নাম্বার
- 327
- নিজ জেলা
- বগুড়া
- ঘটনাস্থল
- কাঁঠালতলা, বগুড়া সদর।
যোদ্ধার গল্প
আসসালামু আলাইকুম আমি, মোঃ আত্তাপুর চৌধুরী তসীন।
২০২৪ সালের জুলাই
আন্দোলন চলাকালীন সময়ে আমি বগুড়া
সৈয়দ আহমেদ কলেজে Inter second year অধ্যয়নরত ছিলাম । আমি পড়াশোনার
পাশাপাশি একটা ডেন্টালে অ্যাসিস্ট্যান্ট
হিসেবে কাজ করতাম। ছাত্র
আন্দোলনে আমি ১৮ জুলাই
থেকে যুক্ত হয়েছিলাম। আমি প্রতিদিনই কম
বেশি আন্দোলনে যেতাম।
শুরুতে
আমার ভীষণ ভয় লাগতো
কারণ কোনোদিন ওইভাবে কোনো আন্দোলনে যাইনি।
নানান শংকা, দ্বিধা কাজ করতো। তারপরও
সেই ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে আন্দোলনে যেতাম
কারণ আমার একটাই কথা
সবসময় মাথায় আসতো যে একটা
ছোট বাচ্চা বা মেয়ে যদি
যাইতে পারে আমি কেনো
পারবোনা কিংবা স্বৈরাচারের যে নিমর্ম অত্যাচার
অব্যাহত রয়েছে সেটা যদি আমার
ভাই বা বোনের সাথে
হতো তাহলেও কি আমি চুপচাপ
বসে থাকতাম!!যার ফলে বাসায়
না জানিয়ে আমি
আমার কাজের বাকি সময়টুকু দুপুরে
খাবার সময় বাসায় না
গিয়ে আন্দোলনে যেতাম। আর বাসায় বলতাম
যে কাজের চাপ ছিল তাই
বাসায় আসিনি। এভাবে প্রতিদিনই আন্দোলন যাওয়া হতো।জুলাই আন্দোলনের এক একটা দিন
ছিল আমার কাছে এক
একটা বিভীষিকাময় দিন,, চোখের সামনে রক্তের বন্যা এখনো আমার মনে
পড়লে শরীর শিউরে উঠে,,,,আজও আমি রাতে
ঠিক ভাবে ঘুমাতে পারিনা
কেননা যখনই জুলাই এর
ভয়াবহতার কথা মনে পরে
আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনা,,
আমার সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে।
তো আমি যখন প্রথম দিন আন্দোলনে যাই,
যাওয়ার পর পুলিশের টিয়ার
গ্যাসে আমার অবস্থা বেশ
শোচনীয় হওয়া সত্ত্বেও
যাওয়া বন্ধ করিনি। এভাবে
প্রতিদিন যাইতাম আল্লাহর রহমতে সুস্থ ভাবে ফিরে আসতাম।
প্রতিদিন সাধারণ
মানুষের যে সাপোর্ট, যে
অকৃত্রিম ভালোবাসা আমরা পেতাম তা
আমাদের অনুপ্রেরণা দিতো, উৎসাহিত করতো, সুদৃঢ় করতো সামনে এগিয়ে
যাওয়ার প্রত্যয়কে।
এই দৃপ্ত পথচলার এক শেষ বিকেলে আমি
আমার জীবনের অন্যতম সেরা মূহুর্তের মুখোমুখি
হই। সেদিন ছিলো ৪ আগষ্ট
বিকাল ৪ টার আগে
পিছে কোন একটা সময়।
আন্দোলন চলাকালীন সময়ে পুলিশের গুলিতে
আহত হই আমি। পুলিশ আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
আমরা বিশ্বাস করি। দূর্ভাগ্যবশত এটা
ছিলো তাদের চূড়ান্ত লেভেলের একটা প্রতারণা
যা আমরা বুঝতে পারিনি।
তারা আত্মসমর্পণের নাটক করে। তাদের
গুলি মাটিতে রেখে সব পুলিশ
রাস্তায় বসে পরে এবং
ওদের সাদা গাড়িটিও থানার
মধ্যে তুলে ফেলে। এরপর
একটা পুলিশ আমাদের সাথে কথা বলার
জন্য এগিয়ে আসে যার ফলে
আমরাও সবাই সামনে এগিয়ে
আসি। তারপর ওই পুলিশ আমাদেরকে
বলতে থাকে দেখো," তোমরা
আমাদের ছেলের মতো, আমরা তোমাদের
কিছু করব না তোমরা
সাতমাথায় যেতে চাচ্ছো তো
যাও"। এই বলে
তিনি চলে যাওয়া মাত্র
বিল্ডিং থেকে আগে থেকেই
সেট করা কিছু পুলিশ আমাদের
দিকে টাগের্ট করে অতর্কিত হামলা
করে। সেখান থেকে একাধারে টিয়ার
গ্যাস ও রাবার বুলেট
ছুড়তে থাকে আমাদেরকে। আমরা
ছত্রভঙ্গ হয়ে এলোমেলো দৌড়াতে
থাকি আর তারা পরিকল্পনামাফিক
বৃষ্টির মতো গুলি করতে
থাকে। একপর্যায়ে আমার পায়ে এসে
গুলি লাগে। আমি প্রথমে বুঝতে
পারিনি যে গুলি লাগছে,
কিন্তু যখন লাগলো আমার
মনে হলো যে পুরো
পৃথিবীটা মনে হয় কেঁপে
উঠল। আমি কোনো ভাবে
এক পায়ে ভর করে
দৌড়াতে থাকলাম এবং একটু যাওয়ার
পর পাশে দোকানের কাছে
শুয়ে পড়ে গেলাম, যাতে
মাথায় কিংবা অন্য কোথাও যেনে
আর না লাগে। তারপর
পায়ের দিকে দেখি রক্ত
দিয়ে পুরো পা সহ
রাস্তা মেখে গেছে। আশেপাশে
কাউকে না পেয়ে ওখানেই
থাকলাম, কিছুক্ষণ পর বন্ধুরা এসে
আমাকে নিয়ে ডায়াবেটিস হাসপাতালে
নিয়ে যায়।আমি তো খুব ভয়ে
ছিলাম আর ব্যথায় কাতরাচ্ছিলাম।
বন্ধুদের বাসায় জানাতে নিষেধ করেছিলাম যেনো বাড়িতে কেউ
টেনশন না করে। ডায়াবেটিস
হাসপাতালে কয়েকটা রাবার বুলেট বের করে দেয়
ডাক্তাররা। যেই ডাক্তার আমার
ট্রিটমেন্ট করেছিলেন তার আন্তরিকতা আমাকে
মুগ্ধ করেছিলো। এরপর বাসায় এসে
বলি যে এমনি খালি
কেটে গেছে। পরের দিন ফ্যাসিস্ট
সরকার পালিয়ে গেলে বিজয় র্যালিতে
হুইল চেয়ারে করে যাই। বাসায়
এসে সবাইকে সত্যি টা বলে দেই
যে আসলে পায়ে গুলি
লেগেছে।চিকিৎসার জন্য অনেক হাসপাতালে
গেলে ফিরিয়ে দেয় এই বলে
যে কিছু করা সম্ভব
নয়, ঔষধ খেতে দিলেও
তাতে খুব একটা কাজ
হতো না। যন্ত্রণা তীব্র
হলে পরে মেডিকেলে ভর্তি
হই। দু:খজনকভাবে সেখানে
প্রপার ট্রিটমেন্ট আমি পাইনি। পরবর্তীতে
সিএমএইচ হাসপাতালে সেনাবাহিনীরা চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়।
সেখানে আবার এক্স রে
করে দেখা যায় ভিতরে
প্রায় ৫০ টার মতো
রাবার বুলেট আছে। ওখানে কয়েকটা
বের করা সম্ভব হয়।কিছুদিন
পর ওখান থেকে রিলিজ
দিলে আলহামদুলিল্লাহ এখন হাঁটাচলা করতে
পারি। কিন্তু মাঝে মধ্যে রাতে
একটু পা ব্যথা করে।
কেননা আমার ২
পায়ে এখনো
৩৫ টার মতো রাবার
বুলেট আছে। এখন প্রতিদিন
এভাবেই চলাফেরা করছি, এগুলোর জন্য বেশি হাঁটতে
ও পারিনা। এটা ভীষণ কষ্ট
দেয় আমায়। কিন্তু যখন ভাবি দেশের
জন্য, নিজের মাটির জন্য এতোটুকু আত্মত্যাগ
যদি না করতাম তবে
বিবেকের কাছে কী জবাব
দিতাম।জীবনতো অর্থহীন
মনে হতো।শহীদদের জন্য, আহতদের জন্য অনেক খারাপ
লাগা কাজ করে। তারপরও
ভীষণ আনন্দ, তীব্র ভালো লাগা আর
অদ্ভুত প্রশান্তি
কাজ করে যখন ভাবি
আমরাতো স্বার্থক কারণ " আমরা এখন স্বাধীন,
আমরা পেরেছি। "
ছবি






