যোদ্ধার প্রোফাইল

মাহাদী আমিন
- ক্যাটাগরি
- ক্যাটাগরি-সি
- নাম
- মাহাদী আমিন
- বয়স
- 13 বছর
- পেশা
- ছাত্র
- এমআইএস নাম্বার
- 35845
- গ্যাজেট নাম্বার
- 1904
- নিজ জেলা
- লক্ষ্মীপুর
- ঘটনাস্থল
- যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
যোদ্ধার গল্প
জুলাই
স্মৃতিচারণা ২০২৪
'বাপ
বেটার চোখে জুলাই'
আমার বাবা অনেক আশা নিয়ে ভালোভাবে পড়ালেখা করে যেন একটি সরকারি চাকুরি করতে পারি সেই জন্য দেশের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান মেট্রপলিটন স্কুল এন্ড কলেজ, যাত্রাবাড়ী শাখায় ভর্তি করে।
বাবার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানটি যাত্রাবাড়ী থানার সামনেই, কয়েক দিন লক্ষ্য করলাম বাবার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে অনেকদিন বাসাতেই থাকছে, বাবাকে বললাম আমার স্কুলও বন্ধ তোমার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ চাচ্চুও দোখি বাসায় থাকে অফিসে যায়না, আমাকে একটু খুলে বলতো এটা কিসের আন্দোলন?
বাবা আমাকে কোটা আন্দোলন বিষয়ে সব বুঝিয়ে বলে, আমি তা শুনে বাবাকে বললাম তাহলে ছাত্রদের আন্দলোনতো অবশ্যই যৌক্তিক।
আমারতো কোটা নেই, আমি কষ্ট করে পড়া লেখা করে যদি সরকারি চাকুরি করতে না পারি তাহলেতো আমার বাবার আশা পুরণ হবে না, মনে অনেক প্রশ্ন জাগে- তাহলে আমি কি মেধা দিয়ে পড়া লেখা শেষ করে কোটার কাছে হেরে যাবো?
পুরো শহর সহ সারা বাংলাদেশেই আন্দোলন চলছে, বাবাকে বললাম তুমিও জন্মাওনি আমিও জন্মাইনি তাই ৭১ এর বিজয় দেখিনি, তাই বলে দেশের মাটিতে জন্ম নিয়ে আমরা যদি আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে ২৪ এর বিজয় না দেখি তা কি হয়?
শুনেছি এবং টিভিতে দেখেছি আমাদের কলেজের বড় ভাই'রা যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলন করে। সেই চিন্তা থেকে বাবার কাছে বায়না ধরি চল দেশকে পুনঃ স্বাধীনতার জন্য টপ রেড এলাকা যাত্রাবাড়ী তে ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ যৌক্তিক আন্দোলনের সমথর্ন দিতে যাই, বাবা রাজি হয়ে আমাকে নিয়ে আন্দোলনে যায়- ৩৫ই জুলাই তথা ০৪ই আগষ্ট ২০২৪।
বাবা আমাকে কিছু পানি এবং বিস্কুট কিনে দেয়, বাবা এবং আমি সেগুলো আন্দোলনরত ছাত্র ও সাধারণ জনগণকে খাওয়াই।
আমার খুব আনন্দ ও ভালোই লাগছিল, দুপুর ২টায় পুরো যাত্রাবাড়ী ছাত্রদের দখলেই ছিল, পুলিশকে দেখেছি নিরব রয়েছে।
কিন্তু হঠাৎ করেই যাত্রাবাড়ী থানার ভিতর থেকে আকস্মিক ভাবে আমাদের দিকে একটি গ্রেনেড ছোড়া হয়, আমরা সবাই ভয় পেয়ে যাই, তারপর আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ গুলি করে, সেখানে আমি এবং আমার বাবা সহ সকলে পুলিশের গুলিতে আহত হই।
যখন গুলি করা হয়, সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারছিলামনা, বাবাকে বললাম বাবা এটাতো আমাদের স্কুলের রাস্তা আমি চিনি, মনে হয় সামনে গুন্ডা বাহিনী বেরেকেড দিয়েছে।
আমাদের সামনে অনেক মানুষ পা পিছলে পরে যায়, আমরাও পা পিছলে সামনের মানুষের উপরে পরে যাই, পিছন পুলিশের গুলি চলতেছে..... পিছন থেকে আমাদে শরীর টপকে সব মানুষ সরে গেলেও আমার বাবা সরে যায়নি, কারন তখন বাবা আমাকে তার বুকের মাঝে আগলে রেখেছে, যেন আমার পিঠে গুলি না লাগে, বাবা'তো বাবাই, বাবা আমাকে কত ভালবাসে তখন বুঝলাম।
আমার এবং বাবার পিঠে যখন অনেক গুলি পরছে অনুভব করতে পারছি, পিছনে ফিরে তাকাইনি যদি গুলি চোখে পরে।
বাবার মুখে যখন একটা গুলি পরে তখন অনেক রক্ত বের হয়, আব্বু কে বলি তোমার কি চোখে গুলি লেগেছে? বাবা আমাকে বলে আমার কিছুই হয়নি, তুমি শান্ত থাক এবং জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাষ নাও, বাবা এতক্ষণ আমাকে শান্তনা দিলেও, এখন আমি বাবাকেই শান্তনা দিচ্ছি।
গুলির সাথে সাথে যখন টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয় শ্বাস নিতে পারছিলামনা, তখন বলি আল্লাহ আমাদের বাঁচাও, আম্মুকে না বলে এসেছি, আমাদের খারাপ কিছু হয়ে গেলে আমি আম্মুকে কি জবাব দিব।
তারপর সেখান থেকে উদ্ধার করে এক পরিচিত আংকেল আমাদের সহ অনেক কেই তাদের বাসায় নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিকেল প্রেরণ করে, ঢাকা মেডিকেল পৌছার আগেই আমার দুই চাচ্চু সানু ও আরিফ সেখানে উপস্হিত থাকে, তাদের সহায়তায় চিকিৎসা নেই।
ঢাকা মেডিকেলে আমাদের মত অনেক লোক গুলিতে আহত এবং নিহত হয়, তাদের দেখে অনেক ভয় পেলেও মনে মনে আনন্দিত হই যেখানে দেশকে পুনঃস্বাধীনের জন্য এত মানুষ আহত ও নিহত হচ্ছে তাহলে আমাদের আন্দোলন বৃথা যাবেনা, বিজয় হবেই, ইনশাআল্লাহ।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে বাসায় আসলে আমাদের শরীরে গুলি, রক্ত ও রক্ত মাখা জামা কাপড় দেখে আম্মু ছোট বোন অনেক কাঁদে। বাসার আশেপাশে অনেকেই দেখতে আসে এবং অনেকেই বাহ্ বাহ্ দিতে থাকে, বাপকা বেটা।
আল্লাহ ভরসায় রাবার বুলেট হওয়ায় মৃত্যুর একেবারে কাছ থেকে আমি আমার বাবা ফিরে এসেছি। বাবার এবং আমার শরীরে এখনও বুলেট রয়েছে, চিকিৎসা চলমান।
আমার এবং বাবার - মাথায় ও শরীরে অনেক গুলি প্রবেশ করায় আশংকা মুক্ত হলেও আতংক মুক্ত হতে পারিনি।
বাবা আমি প্রকৃত যোদ্ধা হয়েও সরাকার কর্তৃক নথিভূক্ত হতে চাইনি, কোন স্বীকৃতিও চাইনি, কিন্তু পরক্ষনে সর্বশেষ সময়ে ডাক্তারের পরামর্শক্রমে সরকারি নথিভূক্ত ভেরাফাইড হই, ডাঃ বলল আপনাদের ভবিষ্যতে বুলেট বের করতে অপারেশন লাগতে পারে, তখন ভেরিফাইড কাগজ প্রয়োজন হবে।
আম্মু বলে - আমার ও বাবার অনেক অস্বাভাবিক আচরন দেখা যায়, তাই সকলের কাছে দোয়া চাই যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারি।
পরের দিন ৩৬ই জুলাই তথা ০৫ই আগষ্ট আন্দোলন আরো গুরতর হয়, বাবা আমি অসুস্হ থাকায় বাসায় টিভিতে দেখতে থাকি, দেশ থেকে স্বৈরাচার হাসিনা পালিয়ে গেল, দেশ আবার স্বাধীন হলো।
বাসায় সবাই আনন্দ করতে করতেই দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়, এই আনন্দের মাঝে হঠাৎ একটি দুঃসংবাদ আসে, যা অনেক শোকে পরিণত হয়।
চারদিকে নের্টওয়ার্ক সমস্যা থাকায় সন্ধ্যায় শুনতে পাই আমার বাবার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগি রিটন চাচ্চু যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনে গিয়ে দুপুর ২টার দিকে পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়।
রিটন চাচ্চু আমার সানু চাচ্চুর বাসায় থাকতেন, সানু চাচ্চু রিটন চাচ্চুকে গুলিবিদ্ধ অবস্হায় যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল নিয়ে গেলে সেখানে রিটন চাচ্চুর মৃত্যু হয়।
তারপর রিটন চাচ্চুকে নিয়ে সানু চাচ্চু সহ তাদের গ্রামের বাড়ি হাতিয়ায় লাশ দাফন করে।
পরবর্তীতে জানতে পারি রিটন চাচ্চুর ছোট ভাই ও বোন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তাদের যাহাতে মেধা দিয়ে সরকারি চাকুরি হয় সেই জন্যই সময় পেলেই রিটন চাচ্চু আন্দোলনে যোগ দিতেন।
রিটন চাচ্চুর মৃত্যুর পর থেকেই বাবার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে রিটন চাচ্চুর শূন্যতায় অনেক ক্ষতিগ্রস্হ হয়, আমার এবং বাবার অসুস্সতায় আমরাও পারিবারিক অনেক ক্ষতি গ্রস্হ হই, সকল ক্ষতি কাটিয়ে আধার কেটে আলো আসবেই, এই প্রত্যাশায়, আল্লাহ হাফেজ।
নামঃ মোঃ মাহাদি আমিন আফরান
প্রতিষ্ঠানের
নামঃ মেট্রোপলিটন স্কুল এন্ড কলেজ, যাত্রাবাড়ী
শাখা।
শ্রেণীর
নামঃ চতুর্থ
ছবি




