জুলাই ভিকটিমস অ্যাসোসিয়েশনজুলাই ভিকটিমস অ্যাসোসিয়েশন

যোদ্ধার প্রোফাইল

মামুন আহমদ

মামুন আহমদ

ক্যাটাগরি
ক্যাটাগরি-বি
নাম
মামুন আহমদ
বয়স
22 বছর
পেশা
অসুস্থ
এমআইএস নাম্বার
19639
গ্যাজেট নাম্বার
1574
নিজ জেলা
সিলেট
ঘটনাস্থল
নয়াসড়ক পয়েন্ট, সিলেট।

যোদ্ধার গল্প

রক্তের টানে রাজপথে: এক মুজাহিদের জুলাই বিপ্লব

​স্মৃতিকথক: জুলাই যোদ্ধা মামুন আহমদ

​

১. চেতনার জাগরণ ও দোদুল্যমানতা-

​২০২৪ সালের ১ জুলাই। বাংলার আকাশ-বাতাস তখন এক স্বৈরাচারী শাসকের অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ক্ষোভ এবং বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠছিল। অধিকার আদায়ের অدم্য প্রত্যয় নিয়ে গড়ে ওঠা 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন' ধাপে ধাপে রূপ নিচ্ছিল এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে। আমি তখন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রাজার গাঁও মাখজানুল উলুম দারুল হাদীস মাদ্রাসার ফযিলত দ্বিতীয় বর্ষের (মেশকাত) একজন সাধারণ ছাত্র। কিতাবের পাতা, ইলমের সাধনা আর মাদ্রাসার চার দেয়ালের শান্ত পরিবেশই ছিল আমার চেনা জগৎ।

​আন্দোলনের শুরুর দিনগুলোতে মনের ভেতর একটা দোদুল্যমানতা ছিল। কিতাব ফেলে রাজপথে যাওয়া কতটা সমীচীন, তা নিয়ে ভাবছিলাম। কিন্তু ১৬ জুলাই রংপুরের বীর ছাত্র আবু সাইদ ভাইয়ের সেই বুক পেতে দেওয়া এবং পুলিশের বুলেটের সামনে অকুতোভয় শাহাদাতের দৃশ্যটি আমার ভেতরের ঘুমন্ত মানুষটাকে ওলটপালট করে দিল। আবু সাইদ ভাইয়ের সেই রক্তভেজা শার্ট, সেই অবিচল চাহনি আমার হৃদয়ে এক তীব্র অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিল। আমি আর ঘরে বসে থাকতে পারলাম না, মাদ্রাসার শান্ত পরিবেশেও স্থির থাকা আমার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ল। ১৭ জুলাই থেকে আমি সিলেটের تপ্ত রাজপথে নেমে এলাম লড়াকু ছাত্রদের সারিতে। নিজে যাওয়ার পাশাপাশি মাদ্রাসার অন্য ভাইদেরও উদ্বুদ্ধ করতে লাগলাম—এ লড়াই তো শুধু কোনো সাধারণ দাবি আদায়ের নয়, এ লড়াই ন্যায়ের পক্ষে এবং জুলুমের বিপক্ষে। এই ক্রান্তিলগ্নে ঘরে বসে থাকা আর কাপুরুষতা প্রদর্শন করা সমান অপরাধ!

​২. রাজপথের ডাক: অসহযোগ আন্দোলন-

​৩ আগস্ট রাতে ফেসবুকের পাতায় ভেসে উঠল এক অমোঘ ও চূড়ান্ত ডাক—৪ আগস্ট থেকে দেশজুড়ে শুরু হবে 'অসহযোগ আন্দোলন'। স্বৈরাচারের পতনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। খবরটি পাওয়া মাত্রই আমাদের মাদ্রাসায় এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হলো। রাতেই আমরা ফযিলত ও দাওরায়ে হাদীসের ছাত্ররা একত্রিত হয়ে আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমণ্ডলীর সঙ্গে এক জরুরি আলোচনায় বসলাম। দেশ ও জাতির এই মহাসংকটে উলামা ও মাদ্রাসার ছাত্রদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলো। অবশেষে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো—আগামীকাল আমরা কেউ ঘরে বসে থাকব না, সবাই জালিমের বিরুদ্ধে মাঠে নামব।

​৪ আগস্টের সকাল। এক নতুন ইতিহাস গড়ার প্রত্যয় নিয়ে আমরা মুতাওয়াসসিতাহ ১ম বর্ষের ছোট ভাই থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদীসের (মাস্টার্স) সব ছাত্র ভাই একত্রিত হলাম। আমাদের বুকে তখন ভয়ের লেশমাত্র নেই, চোখে কেবলই মুক্তির স্বপ্ন। আমরা সবাই মিলে সিলেটের রাজপথে বুক টান করে এসে দাঁড়ালাম। চারদিকে স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছিল সিলেটের আকাশ-বাতাস।

 ৩. নয়াসড়কের সেই রক্তাক্ত বিকেল-

​দুপুর ৩টার দিকে পরিস্থিতির কারণে মাদ্রাসার অধিকাংশ ছাত্র ভাই ফিরে গেলেও, আমার ভেতরের জেদ ও বিপ্লবের আগুন নিভল না। মন কিছুতেই মানছিল না যে এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মাঠ ছেড়ে চলে যাই। আসরের নামাজ শেষ করেই আমি আমার অত্যন্ত প্রিয় সহপাঠী মুহসিন আহমেদকে সাথে নিয়ে আবার ছুটে গেলাম আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু সিলেট নয়াসড়ক পয়েন্টে।

​বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছিল, চারদিকে এক থমথমে ভাব। হঠাৎ করেই খবর এলো, আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর হামলা করার জন্য ধেয়ে আসছে। প্রথমে অল্প কিছু সন্ত্রাসী এসে আমাদের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু আমরাও তো দমে যাওয়ার পাত্র নই; ছাত্র-জনতা একজোট হয়ে ইট-পাথর দিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই কাপুরুষের দল লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেল। তবে এই স্বস্তি ছিল খুবই ক্ষণিকের। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বিশাল দলবল, লাঠি, ধারালো রামদা, দেশীয় অস্ত্র আর পিস্তল নিয়ে চারপাশ থেকে পঙ্গপালের মতো আমাদের ওপর নৃশংস হিংস্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারদিকে শুধু গুলির কানফাটানো আওয়াজ আর সাধারণ মানুষের দিকবিদিক হারিয়ে ছোটাছুটি ও আর্তনাদ।

​কোনো উপায় না দেখে আত্মরক্ষার জন্য আমরা কয়েকজন নয়াসড়ক পয়েন্টের ঠিক পাশের মসজিদের দোতলায় গিয়ে আশ্রয় নিলাম। সেখানে মসজিদের নির্মাণকাজের কিছু ইট স্তূপ করে রাখা ছিল। আমরা সেই ইট দিয়েই ওপর থেকে শেষ চেষ্টা চালাচ্ছিলাম নিচে থাকা খুনিদের ঠেকানোর। কিন্তু সেই হায়েনাদের মনে কোনো ধর্মীয় অনুভূতি বা উপাসনালয়ের পবিত্রতার বোধ ছিল না। তারা মসজিদের পবিত্রতা ভেঙে, জুতো পায়েই দোতলায় উঠে এলো। শুরু হলো লাঠি আর রামদার নৃশংস ও পৈশাচিক কোপ। চারদিক থেকে কোপের আঘাতে রক্তাক্ত হতে লাগল আমাদের ভাইয়েরা। আত্মরক্ষার্থে আমি নিচে দৌড়ে নেমে আসার চেষ্টা করতেই ওরা আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল। কোনো দয়ামায়া ছাড়া রামদার ধারালো কোপ আছড়ে পড়তে লাগল আমার শরীর ও মাথায়।

​"আমার মাথায় পড়ল দুটি গভীর কোপ, কোমরে তিনটি আর পায়ের ওপর চলতে লাগল ধারালো অস্ত্রের তাণ্ডব। কোমরের নিচে ও বাম পায়ের হাঁটুর ওপরে দুটি নৃশংস কোপ দেওয়া হলো, যার আঘাতে আমার বাম পায়ের হাঁটুর গিলা ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। ডান পায়ের দুটি আঙুল তো কেটে প্রায় আলাদাই হয়ে গেল, সামান্য একটু চামড়া দিয়ে ঝুলে রইল কেবল। সেই সাথে বুলেটের আঘাত। তীব্র যন্ত্রণায় আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম, আর ওঠার বিন্দুমাত্র শক্তি ছিল না।"

​৪. হাসপাতালের পথে আরেক দফা নৃশংসতা-

​রক্তের সাগরে ভাসতে থাকা অবস্থায় সন্ত্রাসীরা আমাকে টেনেহিঁচড়ে পাশের একটি বাসায় নিয়ে নির্দয়ভাবে ফেলে রাখল। সেখানে গিয়ে দেখতে পেলাম আরেকজন রক্তাক্ত ভাই যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। সেই বাসার দয়ালু লোকজন আমাদের এই অবস্থা দেখে কোনোমতে আমাদের পরিবারের মোবাইল নাম্বার জোগাড় করে ফোন দিলেন। আমার বাড়ি শহর থেকে বেশ দূরে হওয়ায় তারা ফোনে অনুরোধ করলেন যেন আমাদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর তারা দুটো রিকশায় করে আমাদের সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু খুনিদের নিষ্ঠুরতার কোনো সীমা ছিল না; হাসপাতালের পথে চলন্ত রিকশার ভেতরেও আমাদের ওপর আবারও হামলা চালানো হলো। কোনোমতে আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা উইমেন্স মেডিকেলে পৌঁছালাম।

​উইমেন্স মেডিকেলে পৌঁছানোর পর খবর পেয়ে আমার মা-বাবা হন্তদন্ত হয়ে সেখানে ছুটে এলেন। কিন্তু ততক্ষণে হাসপাতালের বাইরেও সন্ত্রাসীরা রামদা ও অস্ত্র নিয়ে তাণ্ডব শুরু করেছে। আমাদের নিরাপত্তার স্বার্থে হাসপাতালের সিকিউরিটি গার্ডরা মেইন গেইটে তালা মেরে দিলেন এবং সবাইকে ওপরের তলায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সেখানে অত্যন্ত তাড়াহুড়োর মধ্যে কোনো রকমে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আমার পরিবার আমার জীবন বাঁচানোর তাগিদে ছুটে চললেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে।

 ৫. ওসমানী মেডিকেলের অমানুষিক নির্যাতন ও অবহেলা-

​ওসমানী মেডিকেলে পৌঁছানোর পর যে নির্মম এবং পৈশাচিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে, তা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। দেশের একটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ও হাসপাতালের চিকিৎসকেরা যে এতটা অমানুষ হতে পারেন, তা আমার জানা ছিল না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমি রক্তাক্ত, ভাঙা পা ও গুলিবিদ্ধ শরীর নিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে রইলাম, কিন্তু কোনো ডাক্তার বা নার্স আমার দিকে এগিয়ে এলেন না। আমার মা-বাবার আকুতি-মিনতিতেও তাদের মন গলল না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আমাকে একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে চিকিৎসকেরা আমার ক্ষতস্থান দেখে চিকিৎসা করার বদলে তাদের ভেতরের রাজনৈতিক ক্ষোভ উগরে দিতে লাগলেন। তারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর গলায় বললেন:

​"কিসের জন্য আন্দোলনে গিয়েছিলে? আমরা আওয়ামী লীগ করি। এখন তোমাদের চিকিৎসা কে দেবে? সরকার থেকে নিষেধ আছে তোমাদের চিকিৎসা না দেওয়ার!"

​এই অমানুষিক ও পেশাদারিত্বহীন কথাগুলো বলতে বলতেই তারা আমার শরীর থেকে কোনো প্রকার অ্যানেস্থেসিয়া (অবশ করার ওষুধ) ছাড়াই সরাসরি চামড়া ও মাংস কেটে গুলি বের করতে লাগলেন। একটা জ্যান্ত বকরির শরীর থেকে চামড়া ছালটালে যেমন অবর্ণনীয় কষ্ট ও যন্ত্রণা হয়, ঠিক তেমনি নারকীয় যন্ত্রণা দিয়ে তারা আমার শরীর থেকে একে একে বুলেটগুলো টেনে বের করলেন। আমার চিৎকারে হাসপাতালের দেয়ালগুলোও যেন কাঁপছিল, কিন্তু সেই ডাক্তারদের মন গলেনি। এরপর ভাঙা পায়ে নামমাত্র একটা প্লাস্টার করে রাত তিনটার দিকে একটা নোংরা ওয়ার্ডে আমাকে ফেলে রাখা হলো। পরদিন সকালে যখন অন্য ডাক্তার রাউন্ডে এলেন, তিনি আমার অবস্থার দিকে না তাকিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বললেন, "তোমার চিকিৎসা এখানে হবে না, তুমি এখনই বাড়ি যাও, এমনিতেই সুস্থ হয়ে যাবে।" মূলত তারা চাচ্ছিলেন আন্দোলনকারী ছাত্রদের hospital থেকে বের করে দিতে।

​৬. মুক্তির সূর্য ও নতুন লড়াই-

৬ আগস্ট, বাংলার আকাশে তখন এক নতুন সকাল। দেশ তখন স্বৈরাচারমুক্ত, এক নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। স্বৈরাচারের পতনের পর আমার মা-বাবা আমাকে ওসমানী মেডিকেল থেকে নিয়ে আবারও সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজে ভর্তি করালেন। সেখানে বেশ কিছুদিন নিবিড় চিকিৎসার পর আমার শারীরিক অবস্থার জটিলতা বিবেচনা করে আমাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠানো হয়। এরপর সাভার সিআরপি (CRP), মৌলভীবাজার সিআরপি ঘুরে বর্তমানে আমি সিলেট সিআরপিতে চিকিৎসাধীন আছি।

​মাথায় আর শরীরে রামদার সেই গভীর ক্ষত আর পঙ্গুত্ব নিয়ে আজও আমি বিছানায় শুয়ে লড়াই করে যাচ্ছি। হয়তো আগের মতো আর কোনোদিন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারব না, হয়তো চিরদিনের জন্য হারিয়েছি সচল পা দুখানি। কিন্তু আজ আমি পরম তৃপ্ত, আজ আমি গর্বিত। আমি আর কেউ নই, আমি রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশের একজন গেজেটেড 'জুলাই যোদ্ধা' মামুন আহমদ। আমার শরীরে লেগে থাকা প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন, প্রতিটি বুলেটের দাগ আর এই পঙ্গুত্ব আজ এক একটি স্বাধীন মানচিত্রের গল্প বলে। আগামী প্রজন্ম যখন এই মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেবে, তখন আমাদের এই ত্যাগ সার্থক হবে।

ছবি

মামুন আহমদ
মামুন আহমদ
মামুন আহমদ
মামুন আহমদ
মামুন আহমদ
মামুন আহমদ