যোদ্ধার প্রোফাইল

মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন
- ক্যাটাগরি
- ক্যাটাগরি-বি
- নাম
- মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন
- বয়স
- 50 বছর
- পেশা
- ব্যবসা
- এমআইএস নাম্বার
- 12753
- গ্যাজেট নাম্বার
- 567
- নিজ জেলা
- ঝালকাঠি
- ঘটনাস্থল
- মেরুল বাড্ডা
যোদ্ধার গল্প
''রক্ত,
অশ্রু ও প্রতিবাদের বিনিময়ে
আমার চোখে দেখা ৩৬শে
জুলাই এর উত্তাল ইতিহাস''
আমার নাম মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন, গ্রামের বাড়ী ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর থানার আদাখোলা গ্রামে, ঢাকার মহাখালী এলাকায় ভাড়া বাসায় বসাবাস, ছোটখাটো মাছের ব্যবসা করি, বয়স ৫০।
২০২৪ সালের জুলাই মাস আমার জীবনের এমন একটি সময়, যে সময়ের কথা মনে পড়লে আজও বুকের ভেতর এক ধরনের শূন্যতা ও কষ্ট অনুভব করি। সেই সময় আমি শুধু একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে রাস্তায় নামিনি; নিজের এবং আমার ছেলে মেয়ের অধিকার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। তখন বুঝতে পারিনি, একটি আন্দোলন আমার জীবনের গতিপথ এতটা বদলে দেবে।
আন্দোলনের শুরুতে আমি এলাকার মানুষদের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে শুরু করি। প্রথম দিকে পরিবেশটা তুলনামূলক শান্ত ছিল। আমরা মিছিল করতাম এবং সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের দাবির কথা তুলে ধরতাম। ধীরে ধীরে আন্দোলন বড় হতে থাকে এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসে।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি অনেক বেশি উত্তপ্ত হয়ে যায়। রাস্তায় পুলিশ, সংঘর্ষ, টিয়ারশেল ও গুলির শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে চারপাশের পরিবেশ ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তারপরও আমরা পিছিয়ে যাইনি। আমার মনে হচ্ছিল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এই সময়ে ঘরে বসে থাকা সম্ভব নয়।
আন্দোলনের ৫ই আগস্ট আমি আবারও মিছিলে অংশ নিতে বের হই। আমাদের সঙ্গে অনেক ছাত্র, তরুণ ও সাধারণ মানুষ ছিলেন। আমরা স্লোগান দিতে দিতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে যায়। চারপাশে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। টিয়ারশেলের ধোঁয়া ও মানুষের চিৎকারে কিছুই পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছিল না।
ঠিক সেই সময় হঠাৎ করে পুলিশের গুলি এসে লাগে। মাথায় গুলি লাগার পর আমি গুরুতরভাবে আহত হয়ে পড়ি। প্রথম মুহূর্তে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলেও তার চেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি কি এখান থেকে সুস্থভাবে ফিরতে পারব?
আশপাশের কয়েকজন মানুষ আমাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। এরপর আমাকে বাড্ডার জেনারেল হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে বলা হয় আমরা এই পেশেন্টদের কোন চিকিৎসা করতে পারবো না সেখানের চিকিৎসকেরা আমার অবস্থা দেখে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে যাওয়ার সেই সময়টা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে এমন অবস্থা দেখি যে আমার মত আরো হাজারো মানুষ ওইখানে গুলি অবস্থায় পড়ে আছে হাসপাতালে মেঝে রক্তে রক্তাক্ত হয়ে আছে হাসপাতালের এমন অবস্থা চিকসকরা কাকে রেখে কাকে দেখবে সেটাই বুঝতে পারছিল না যেহেতু আমার মাথায় গুলি লেগেছে তাই আমার পরিবারকে বলে হাসপাতালে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমার আঘাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আমাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গিয়ে আমার মাথার খুলি কেটে সম্পূর্ণ মাথা ওয়াশ করার প্রয়োজন হয়। চিকিৎসার সময় প্রচণ্ড ব্যথা, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা আমার পাশে ছিলেন। তাদের চোখের পানি দেখে বুঝতে পেরেছিলাম, আমার জন্য তারা কতটা চিন্তিত ছিলেন।
চিকিৎসার দিনগুলো সহজ ছিল না। শারীরিক ব্যথার পাশাপাশি মনে নানা প্রশ্ন ঘুরত। আমি কি বেঁচে যাব আর বেঁচে গেলেও কি আগের মতো সব কাজ করতে পারব? স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব? এসব প্রশ্ন আমাকে আরো ভিতর থেকে দুর্বল করছিল।
ধীরে ধীরে চিকিৎসা চলতে থাকে। ১০-১২ দিন পরে আমাকে আইসিও থেকে বের করে বাহিরের একটি ওয়ার্ডে দেওয়া হল সেখানে গিয়ে এমন অবস্থা দেখি যে সেখানে একটি সুস্থ মানুষ থাকলে অসুস্থ হয়ে যাবে আর সেখানে আমি মাথায় গুলি লাগা পেশেন্ট আমাকে এমন একটি জায়গায় বদলি করে দিল এমন পরিবেশ আর অবস্থা দেখে আমার পরিবারের মানুষ আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরা মানেই যে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে, তা নয়। বরং শুরু হয় আরেকটি লড়াই—সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার লড়াই।
এখনো আমার মাথায় গুলি লাগার সেই আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বর্তমানে আমার মাথাব্যথা মাথা ঘুরানো হাঁটতে সমস্যা অস্ত্রপাচারের পরের সমস্যা ইত্যাদি মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেয় জুলাইয়ের সেই দিনের কথা। এখনো নিয়মিত চিকিৎসা ঔষধ ফিজিওথেরাপি এবং ফলোআপ নেওয়ার দরকার পড়ছে।
তবে আমি শুধু নিজের কষ্টের কথা ভাবি না। জুলাইয়ের আন্দোলনে আমার মতো অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। অনেকেই তাদের চোখের দৃষ্টি, হাত-পা কিংবা স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছেন। সরকারি তথ্যের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে; অনেক আহত ব্যক্তি এখনো দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মধ্যে রয়েছেন।
আমার কাছে জুলাই শুধু একটি মাসের নাম নয়। জুলাই আমার জীবনের একটি অধ্যায়—যেখানে আছে সাহস, ভয়, ব্যথা, কান্না, মানুষের সহযোগিতা এবং নতুন করে বেঁচে থাকার প্রত্যয়। আমি আহত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সেই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও শক্ত করেছে।
আজও যখন জুলাইয়ের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে মিছিল, মানুষের স্লোগান, রাস্তায় ছুটে চলা মানুষ এবং হাসপাতালের সেই দিনগুলো। শরীরের ক্ষত হয়তো একদিন অনেকটাই ভালো হয়ে যাবে, কিন্তু জুলাইয়ের স্মৃতি আমার জীবনে থেকে যাবে।
আমি চাই, যারা জুলাইয়ের আন্দোলনে আহত হয়েছেন, তারা যেন যথাযথ চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সম্মান পান। আর যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ যেন কখনো ভুলে না যায় কেউ।
জুলাই আমাকে শিখিয়েছে—জীবন কখনো কখনো কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করায়। কিন্তু মানুষের সাহস, ভালোবাসা এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি অনেক বড়। সেই শক্তি নিয়েই আমি আজও সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।
🔴জুলাই ২০২৪ আমার জীবনের একটি গল্প নয়; এটি আমার হৃদয়ে লেখা এক ইতিহাস। সেই ইতিহাসের কিছু পৃষ্ঠা অশ্রুতে ভেজা, কিছু পৃষ্ঠা রক্তে লেখা, আর কিছু পৃষ্ঠা সাহসে পূর্ণ।
🔴 জুলাই ২০২৪ কোনো সমাপ্তি নয়; এটি এমন এক স্মৃতি, যা আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—অন্যায়ের সামনে নীরব না থেকে, মানুষের জন্য, ন্যায়ের জন্য এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার নামই জীবন।
ছবি






