জুলাই ভিকটিমস অ্যাসোসিয়েশনজুলাই ভিকটিমস অ্যাসোসিয়েশন

যোদ্ধার প্রোফাইল

মোঃ সুজন মিয়া

মোঃ সুজন মিয়া

ক্যাটাগরি
ক্যাটাগরি-বি
নাম
মোঃ সুজন মিয়া
বয়স
25 বছর
পেশা
ছাত্র
এমআইএস নাম্বার
17460
গ্যাজেট নাম্বার
1295
নিজ জেলা
টাঙ্গাইল
ঘটনাস্থল
মির্জাপুর, টাঙ্গাইল।

যোদ্ধার গল্প

শরীরে শত শত স্প্লিন্টার, থমকে থাকা স্বপ্ন: জুলাইযোদ্ধা মোঃ সুজন মিয়ার গল্প

 

স্মৃতিকথক: জুলাইযোদ্ধা মোঃ সুজন মিয়া

 

২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলন যখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন আমিও একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। আমার মনে ছিল একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন—যেখানে শিক্ষার্থীরা ন্যায্য অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারবে এবং মানুষ মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবে।

 

আন্দোলনের দিনগুলোতে আমি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে গোড়াই হাইওয়ে থানার সামনে আন্দোলনে অংশ নিই। তখন আমার চোখেও ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক স্বপ্ন। পড়াশোনা শেষ করে নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু সেই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা আমার জীবনকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যার যন্ত্রণা আজও প্রতিদিন অনুভব করতে হয়।

 

আন্দোলনের সময়ের আঘাতের কারণে আমার শরীরে এখনো প্রায় ৩০০টি স্প্লিন্টার রয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০টি রয়েছে মাথায়। শরীরের ভেতরে এতগুলো স্প্লিন্টার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কতটা কঠিন, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্রতিটি দিন আমার কাছে যেন নতুন করে শারীরিক যন্ত্রণার মুখোমুখি হওয়ার দিন।

 

আমি চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। সর্বশেষ গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি। কিন্তু চিকিৎসা গ্রহণের পরও আমার শারীরিক সমস্যাগুলো পুরোপুরি দূর হয়নি। এখনো প্রায়ই তীব্র মাথাব্যথায় ভুগি। শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্নায়ু ও মাংসপেশিতে টান ধরে, অনেক সময় হাত-পা সোজা করতে পারি না। কখনো মাংসপেশি অবশ হয়ে আসে, আবার কখনো শরীরের অস্বস্তি ও ব্যথা দৈনন্দিন কাজকর্মকে কঠিন করে তোলে।

 

রাতের সময়টাও আমার জন্য স্বস্তির নয়। শারীরিক সমস্যার কারণে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। একজন মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যে বিশ্রাম প্রয়োজন, সেটুকুও অনেক সময় আমার জীবনে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। দিনের পর দিন এই সমস্যাগুলোর সঙ্গে লড়াই করতে করতে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তবুও আমাকে চেষ্টা করে যেতে হয়।

 

আমি একজন ছাত্র। আমার জীবনের এই সময়টাতে নিয়মিত পড়াশোনা করা, নতুন কিছু শেখা এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার কথা ছিল। অথচ শরীরে রয়ে যাওয়া স্প্লিন্টার এবং প্রতিনিয়ত দেখা দেওয়া শারীরিক জটিলতা আমাকে বারবার সেই স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। যখন মাথাব্যথা শুরু হয় কিংবা হাত-পা সোজা করতে কষ্ট হয়, তখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। কখনো ভাবি, কবে আবার সুস্থভাবে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারব, কবে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাব।

 

আমার শরীরে থাকা স্প্লিন্টারগুলো শুধু আঘাতের চিহ্ন নয়; এগুলো আমার জীবনের এক কঠিন অধ্যায়ের স্মারক। জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পর থেকে আমাকে যে বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, তা আমার প্রতিদিনের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। আমার কাছে জুলাইয়ের স্মৃতি শুধু ইতিহাসের একটি ঘটনা নয়, বরং এমন এক অভিজ্ঞতা, যার প্রভাব এখনো শরীর ও মনে বহন করে চলেছি।

 

আমি চাই, আমার মতো আহত জুলাইযোদ্ধাদের শারীরিক সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হোক। প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা হোক। কারণ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা নিয়ে বেঁচে থাকা একজন মানুষের জন্য শুধু একবার চিকিৎসা নেওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক চিকিৎসা ও সহায়তা।

 

আমি এখনো আশাবাদী। আমার শরীরের সমস্যাগুলো যতই কঠিন হোক, আমি আবারও নিজের জীবনে ফিরে যেতে চাই। পড়াশোনা শেষ করতে চাই, নিজের স্বপ্নগুলো পূরণ করতে চাই এবং পরিবারের ও দেশের জন্য একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে চাই।

 

আমি মোঃ সুজন মিয়া—একজন শিক্ষার্থী, একজন আহত জুলাইযোদ্ধা। আমার শরীরে রয়ে গেছে প্রায় ৩০০টি স্প্লিন্টার, মাথায় রয়েছে প্রায় ৭০টি। প্রতিদিনের ব্যথা, অনিদ্রা ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমার লড়াই এখনো শেষ হয়নি। তবুও আমি বিশ্বাস করি, যথাযথ চিকিৎসা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা পেলে একদিন আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজে পাব।

 

আমার প্রত্যাশা, জুলাইয়ের ইতিহাসে শুধু আন্দোলনের ঘটনাগুলো নয়, আহত যোদ্ধাদের পরবর্তী জীবনের সংগ্রামও সংরক্ষিত থাকবে—যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে, একটি ঐতিহাসিক ঘটনার পরও অনেক মানুষের লড়াই প্রতিদিন চলতে থাকে।

ছবি

মোঃ সুজন মিয়া
মোঃ সুজন মিয়া
মোঃ সুজন মিয়া
মোঃ সুজন মিয়া